বাংলাদেশের আমদানি ব্যয়ের সবচেয়ে বড় খাত জ্বালানি। গত অর্থবছরে (২০২৪-২৫) এ খাতের পণ্য আমদানিতে সরকারের ব্যয় হয়েছে প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা। পরিশোধিত ও অপরিশোধিত জ্বালানি তেল, এলএনজি, এলপিজি ও কয়লা আমদানিতে এ বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়েছে। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের গত দেড় দশকের শাসনামলে বিপুল ব্যয়ের এ আমদানি খাতকে ঘিরে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে ওঠে। নির্দিষ্ট কিছু ট্রেডিং কোম্পানি, রাজনৈতিক নেতা ও মধ্যস্বত্বভোগীকে ঘিরে আবর্তিত হয় সিন্ডিকেট। অভিযোগ রয়েছে, কমিশন বা ফির নামে জ্বালানি পণ্য আমদানিতে ঘুস বাণিজ্য হয়েছে বড় অংকের অর্থের। এ ঘুস বাণিজ্যের বড় অংশ পরিশোধ হয়েছে বিদেশে। ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয় আওয়ামী সরকার, দলটির রাজনৈতিক নেতারা পালিয়ে যান। জ্বালানি পণ্য আমদানিতে তাদের এসব দুর্নীতি-অনিয়ম অন্তর্বর্তী সরকার খতিয়ে দেখবে এমন প্রত্যাশা ছিল খাতসংশ্লিষ্টদের। কিন্তু বর্তমানে জ্বালানি খাতে ক্রয়, আমদানির ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও উন্মুক্ততা তৈরি করা হলেও জ্বালানি পণ্য আমদানি ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি এ খাতে বিভিন্ন মহলের সিন্ডিকেট তৎপরতা আগের চেয়ে বেড়েছে বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
যদিও মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ নির্বাহীরা বলছেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বিগত সরকারের সময়ে কী হয়েছে তার চেয়ে এখন দেখার বিষয় এ খাতে স্বচ্ছতার কোনো ঘাটতি হচ্ছে কিনা। সরকারি নিয়ম-নীতি অমান্য হচ্ছে কিনা। বরং বিশেষ আইন বাতিল করে এখন প্রতিযোগিতামূলক বাজার তৈরি করা এবং সেই সঙ্গে ব্যয়সাশ্রয়ী নীতিও অনুসরণ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট ১ লাখ ৪৩ হাজার ২৬৪ কোটি টাকার জ্বালানি পণ্য আমদানি করা হয়েছে। এর মধ্যে ৫২ হাজার ৯৬৪ কোটি টাকার পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করেছে বাংলাদেশ। একই সময়ে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি হয়েছে ১৩ হাজার ৩৮০ কোটি টাকার। আর এলএনজি ও এলপিজি আমদানিতে আরো ৫৯ হাজার ৯০৬ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। কয়লা আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ১৭ হাজার ১৪ কোটি টাকা।
বিপুল পরিমাণ এ জ্বালানি পণ্য মূলত জিটুজি ও উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে কেনা হয়। জিটুজি প্রক্রিয়ায় পণ্য আমদানিতে অস্বচ্ছতার অভিযোগ না থাকলেও মূলত স্পট মার্কেট থেকে সরবরাহকারী অনেক কোম্পানির বিরুদ্ধে বিগত সরকারের সময়ে কমিশন বাণিজ্য, টেন্ডার মেকানিজম ও দুর্নীতির অভিযোগ ছিল। এমনকি এসব কোম্পানির দুই-একটির সঙ্গে আওয়ামী লীগ সরকারের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপুর ভাই, বন্ধু ও আত্মীয়স্বজনের ব্যবসায়িক সংশ্লিষ্টতাও ছিল। তবে জ্বালানি আমদানি বাণিজ্যকে ঘিরে অভিযোগ শুধু আন্তর্জাতিক কোম্পানির বিরুদ্ধে ছিল বিষয়টি এমন নয়, বরং স্থানীয়ভাবে এসব কোম্পানিকে কাজ পাইয়ে দিতে তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের নেতা ও আমলাদের বড় যোগসাজশ ছিল।
আমদানি বাড়াতে এ লবির তৎপরতার কারণে স্থানীয় গ্যাস অনুসন্ধানে বড় আকারে বিনিয়োগ করা যায়নি। এ আমদানির কারণে রাষ্ট্রের বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা খরচ হয়েছে। পেট্রোবাংলার সূত্রমতে ২০১৮-১৯ অর্থবছর থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত ২ লাখ কোটি টাকার বেশি এলএনজি আমদানি করা হয়েছে। অন্যদিকে স্থানীয় গ্যাস অনুসন্ধানে যে পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করা হয়েছে তা যৎসামান্য।
দেশের জ্বালানি সংকট কাটাতে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার শাসনামলে ২০১৭ সালে গ্যাসের মহাপরিকল্পনায় স্থানীয় গ্যাস খাতে বড় বিনিয়োগের পরামর্শ দেয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পরিবর্তে গ্যাস সংকট কাটাতে এলএনজি আমদানির পথ বেছে নেয়া হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সমন্বিত মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে। এ পরিকল্পনায় দেশে গ্যাস খাতে ২০২৬ থেকে ২০৫০ সাল পর্যন্ত এলএনজি টার্মিনাল ও পাইপলাইনে ২৫-৩০ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ের পরিকল্পনা করা হয়েছে। আর গ্যাস অনুসন্ধান (স্থলভাগ ও সাগরে) ১০-১২ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ প্রাক্কলন রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনুসন্ধান পরিকল্পনায় যে বিনিয়োগের কথা বলা হয়েছে তা যথাযথ ব্যয় করা গেলে গ্যাস উৎপাদনে বড় অগ্রগতির সম্ভাবনা রয়েছে।
আওয়ামী সরকারের সময়ে দেশে এলএনজি আমদানিতে ঘুরেফিরে চারটি কোম্পানি কাজ পেয়েছে। এগুলো হলো সিঙ্গাপুরের ভিটল এশিয়া পিটিই সিঙ্গাপুর ও গানভর, সুইজারল্যান্ডের টোটাল এনার্জিস ও যুক্তরাষ্ট্রের এক্সিলারেট এনার্জি। পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, বিগত সরকারের আমলে ৬০ শতাংশের বেশি এলএনজি সরবরাহ করেছে ভিটল এশিয়া ও গানভর।
বর্তমানেও বাংলাদেশে পরিশোধিত জ্বালানির অন্যতম সরবরাহকারী কোম্পানি ভিটল এশিয়া। কোম্পানিটির মূল প্রতিষ্ঠান ভিটল ইনকরপোরেটেডের বিরুদ্ধে নানা সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ঘুস প্রদান ও অনিয়মের অনেক অভিযোগ রয়েছে। ২০০৫ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে ব্রাজিল, একুয়েডর ও মেক্সিকোয় কর্মকর্তাদের ঘুস দিয়ে তেল বাণিজ্যে সুবিধা নেয়ার কথা তারা স্বীকার করেছে। এ অভিযোগে ২০২০ সালের ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগে মামলার সমাধান করতে কোম্পানিটি ১৩৫ মিলিয়ন ডলার ক্রিমিন্যাল পেনাল্টি এবং যুক্তরাষ্ট্রের কমোডিটি ফিউচার ট্রেডিং কমিশনকে আরো ১৬ মিলিয়ন ডলারসহ মোট ১৬০ মিলিয়ন ডলারের বেশি পরিশোধ করে। ব্রাজিলে পেট্রোব্রাস থেকে গোপন তথ্য ও সুবিধাজনক চুক্তি নেয়ার জন্য মিলিয়ন ডলার ঘুস দেয়ার অভিযোগও ওঠে। ঘুসের বাইরে জ্বালানি বাজারে দামের মানদণ্ড (বেঞ্চমার্ক) প্রভাবিত করার চেষ্টার অভিযোগও আছে এ কোম্পানির বিরুদ্ধে। এছাড়া ২০২১ সালে শ্রীলংকা সরকার পেট্রোলিয়াম জ্বালানি সরবরাহে অনিয়মের কারণে ভিটলকে কালো তালিকাভুক্ত করে।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ভিটল এশিয়া বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) ও পেট্রোবাংলার অন্যতম শীর্ষ জ্বালানি সরবরাহকারী ছিল। স্পট মার্কেট থেকে ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত যত কার্গো এলএনজি আমদানি করা হয়েছে, সেখানে শীর্ষ সরবরাহকারী ছিল ভিটল এশিয়া পিটিই সিঙ্গাপুর। পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, এ সময়কালে স্পট মার্কেট থেকে ১৩০ কার্গো এলএনজি আমদানি করা হয়। যার মধ্যে ৪০ কার্গো সরবরাহ করে ভিটল এশিয়া।
অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর ভিটল এশিয়া থেকে বড় আকারে জ্বালানি তেল ও এলএনজি কেনা হচ্ছে। উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে কাজ পেলেও অতীতে কোম্পানিটির এলএনজি ও জ্বালানি তেল সরবরাহে বড় ধরনের কোনো অনিয়ম-দুর্নীতি ছিল কিনা তা খতিয়ে দেখা হয়নি বলে অভিযোগ তুলেছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পরও বিপিসির জ্বালানি তেল সরবরাহে কাজ পেয়েছে ভিটল এশিয়া। গত ২৪ নভেম্বর সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত কমিটির বৈঠকে সিঙ্গাপুর থেকে ১৪ লাখ ২০ হাজার টন জ্বালানি তেল আমদানির অনুমোদন দেয়া হয়। এ তেল আমদানি করতে ব্যয় হবে ১০ হাজার ৯৭৯ কোটি ১ লাখ ৯০ হাজার টাকা, যার অন্যতম সরবরাহকারী হিসেবে রয়েছে ভিটল এশিয়ার নাম।
দেশে দুইভাবে জ্বালানি তেল আমদানি হয়। এর মধ্যে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল জিটুজি চুক্তিতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) দুটি দেশ থেকে কেনে। এর মধ্যে একটি সৌদি আরবের সৌদি অ্যারাবিয়ান অয়েল কোম্পানি বা সৌদি আরামকো থেকে। অন্যটি সংযুক্ত আরব আমিরাতের কোম্পানি আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি লিমিটেড বা এডনক। দুটি কোম্পানি থেকে বাংলাদেশ বছরে প্রায় ১৫ লাখ টন জ্বালানি তেল কেনে।
এছাড়া বিশ্বের আটটি দেশের মোট নয়টি কোম্পানি থেকে বিপুল পরিমাণ পরিশোধিত জ্বালানি তেল কেনে সরকার। এর মধ্যে কুয়েতের পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (কেপিসি), মালয়েশিয়ার পেটকো ট্রেডিং লাবুয়ান কোম্পানি লিমিটেড (পিটিএলসিএল), আরব আমিরাতের এমিরেটস ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি (ইনক), চীনের পেট্রোচায়না (সিঙ্গাপুর) পিটিই লিমিটেড, ইন্দোনেশিয়ার পিটি বুমি সিয়াক পুসাকু (বিএসপি), চীনের ইউনিপেক (সিঙ্গাপুর) পিটিই লিমিটেড, থাইল্যান্ডের পিটিটি ইন্টারন্যাশনাল ট্রেডিং পিটিই লিমিটেড, ভারতের নুমালিগড় রিফাইনারি লিমিটেড (এনআরএল) ও ওমানের ওকিউ ট্রেডিং লিমিটেড।
দেশে এলএনজি কেনায় জিটুজি চুক্তির আওতায় ওমান ও কাতার থেকে এলএনজি কেনে বাংলাদেশ। এর পাশাপাশি উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কেনা হয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কোম্পানি হলেও মূলত সিঙ্গাপুরভিত্তিক এসব কোম্পানির কাছ থেকে দেশে এলএনজি আসে।
স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি সরবরাহকারী বড় কোম্পানি ভিটল এশিয়া পিটিই লিমিটেড। বিশ্বের বৃহত্তম স্বাধীন তেল ব্যবসায়ী কোম্পানিটির প্রধান সদর দপ্তর সুইজারল্যান্ডের জেনেভায়। কোম্পানিটি মূলত নাইজেরিয়া, অ্যাঙ্গোলা, কাজাখস্তান, রাশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে অপরিশোধিত তেল-গ্যাস সংগ্রহ করে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র থেকেও তারা প্রচুর পরিমাণ শেল অয়েল কেনাবেচা করে। এরা মূলত কাতার থেকে বড় পরিসরে এলএনজি সংগ্রহ করে। এছাড়া তারা মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাজাখস্তান ও সিঙ্গাপুরের রিফাইনারিগুলো থেকে পরিশোধিত তেল সংগ্রহ করে বাংলাদেশে পাঠায়।
স্পট মার্কেটে গানভরের কাছ থেকে এলএনজি কেনে বাংলাদেশ। গানভর গ্রুপ বিশ্বের অন্যতম বড় স্বাধীন কমোডিটি ট্রেডিং হাউজ। এর সদর দপ্তর সুইজারল্যান্ডের জেনেভায়। ঐতিহাসিকভাবে গানভর রাশিয়া থেকে সবচেয়ে বেশি জ্বালানি সংগ্রহ করে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, লাতিন আমেরিকা ও আফ্রিকা থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করছে কোম্পানিটি। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত থেকে জানা গেছে, গানভর বর্তমানে অ্যাঙ্গোলা, নাইজেরিয়া ও গায়ানা (দক্ষিণ আমেরিকা) থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করে বাংলাদেশে সরবরাহ করছে।
টোটাল এনার্জিস বিশ্বের সাতটি প্রধান তেল কোম্পানির একটি। এর প্রধান কার্যালয় ফ্রান্সে। টোটাল এনার্জিস শুধু কেনাবেচা করে না, তারা নিজেরাও উত্তোলন করে। তাদের প্রধান উৎস দেশ হলো কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, নাইজেরিয়া, অ্যাঙ্গোলা, নরওয়ে ও যুক্তরাষ্ট্র। তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের জন্য তারা অস্ট্রেলিয়া ও কাতারের ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল। বাংলাদেশে এলএনজি সরবরাহের ক্ষেত্রে তারা মূলত তাদের নিজস্ব প্রকল্পগুলো ব্যবহার করে। এর মধ্যে কাতার, অস্ট্রেলিয়া ও অ্যাঙ্গোলা উল্লেখযোগ্য। এছাড়া তারা নাইজেরিয়া ও ওমান থেকেও জ্বালানি সংগ্রহ করে বাংলাদেশে পাঠায়।
এক্সিলারেট এনার্জি মূলত যুক্তরাষ্ট্রের একটি কোম্পানি। এর সদর দপ্তর টেক্সাসের দ্য উডল্যান্ডসে অবস্থিত। এটি মূলত ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল প্রযুক্তি এবং এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) সরবরাহের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত। এক্সিলারেট এনার্জি বাংলাদেশে মূলত দুটি উপায়ে জ্বালানি বা এলএনজি সরবরাহ নিশ্চিত করে। বাংলাদেশ সরকার ও পেট্রোবাংলার সঙ্গে এক্সিলারেট এনার্জির দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তি রয়েছে। এ চুক্তির আওতায় তারা মূলত কাতার থেকে এলএনজি সংগ্রহ করে বাংলাদেশে সরবরাহ করে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও হাব থেকে এলএনজি ও জ্বালানি তেল সংগ্রহ করে বিভিন্ন দেশে বাণিজ্য করছে এসব কোম্পানি। স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কেনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বড় নির্ভরতা সিঙ্গাপুরভিত্তিক এসব ট্রেডিং কোম্পানি।
দেশের বিদ্যুৎ খাতে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর জ্বালানি সরবরাহের বড় উৎস দেশ ইন্দোনেশিয়া। বৈশ্বিকভাবে কয়লার দাম, যাতায়াতের দূরত্ব বিবেচনায় দেশটির কয়লাকে সবচেয়ে বেশি সাশ্রয়ী ধরা হয়। কিন্তু দেখা গেছে কয়লা কেনার ক্ষেত্রে কয়লার মানে তারতম্য, বেশি দরে অস্ট্রেলিয়া ও আফ্রিকার কয়লাকে ভিত্তিমূল্য হিসেবে ধরা হয়েছে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তিতে। বিগত সরকারের আমলে এসব চুক্তির শর্ত নিয়ে বিভিন্ন কোম্পানির বিরুদ্ধে নানা সময়ে দুর্নীতি ও অভিযোগ ছিল। সেই বিষয়গুলো নিয়ে তদন্ত করার বড় সুযোগ ছিল বলে মনে করেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
দেশের জ্বালানি পণ্য কেনার ক্ষেত্রে এককভাবে কোনো কোম্পানিকে অগ্রাধিকার দেয়া, ঘুস বাণিজ্য, অনিয়ম-দুর্নীতির বড় অভিযোগ ছিল বিভিন্ন সময়, যে বিষয়ে তদন্ত, ফরেনসিক অডিট করার পরামর্শ ছিল আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের। কিন্তু বিগত সরকার তা করেনি। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার জ্বালানি খাতের লোকসান ও সিন্ডিকেট ভাঙতে আরো জোরালোভাবে কাজ করতে পারত বলে মনে করেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের উপাচার্য অধ্যাপক ম. তামিম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশে জ্বালানি পণ্য আমদানি ও কেনাকাটায় অতীতে বড় ধরনের সিন্ডিকেটের অভিযোগ ছিল। এ সিন্ডিকেট এখনো বিদ্যমান। অভিযোগের বিষয়গুলোয় পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন ছিল। যেটা করা গেলে জ্বালানি খাতে দুর্নীতি-অনিয়ম কিংবা ঘুস লেনদেনের বিষয়গুলো পরিষ্কার হওয়ার সুযোগ ছিল।’
বিভিন্ন কোম্পানির মাধ্যমে বছরের পর বছর জ্বালানি তেল কেনা হলেও আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য কমার পরিপ্রেক্ষিতে বড় কোনো সুবিধা পায়নি দেশের ভোক্তারা। এ সুফল না পাওয়ার পেছনে মূলত পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানিতে বিপিসির বড় অর্থ ব্যয়, সংস্থাটির আয়-ব্যয় হিসাবের প্রাক্কলনে বড় ধরনের ত্রুটি ও অনিয়মের অভিযোগ ছিল নানা সময়।
বিদেশী প্রতিষ্ঠান দিয়ে বিপিসির অডিট করানোর জন্য অতীতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বাংলাদেশ সরকারকে অনুরোধ করলেও তাতে কোনো সরকারই আগ্রহ দেখায়নি। বিগত আওয়ামী সরকার বিপিসির ক্ষেত্রে এ ধরনের কোনো অডিটের আয়োজন করেনি। এ ধারা অব্যাহত আছে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও।
দেশের জ্বালানি খাতে জিটুজি চুক্তির বাইরে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি ও পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করে সরকার। এ জ্বালানি পণ্য দেশে সরবরাহ করার ক্ষেত্রে পছন্দের কোম্পানিকে বারবার কাজ দেয়ার অভিযোগ ছিল বিগত সরকারের সময়ে। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে অতিরিক্ত ব্যয় ও আর্থিক ক্ষতি কমাতে মন্ত্রণালয় থেকে বিভিন্ন কমিটি করা হলেও আগের সরকারের অনিয়ম-দুর্নীতি তদন্তে ফরেনসিক অডিট করার উদ্যোগ এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান নয়।
আওয়ামী আমলের ১৫ বছরের বেশি সময় অনিয়ম ও লুটপাটের একটি বড় ক্ষেত্র ছিল বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত। অর্থনীতি নিয়ে শ্বেতপত্র কমিটির প্রতিবেদনে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে অন্তত ৬০০ কোটি ডলার অনিয়ম-দুর্নীতির কথা উঠে আসে। এসব অনিয়ম-দুর্নীতি হয়েছে এ খাতের কমিশন বাণিজ্যে। বিগত সরকারের সময়ে এলএনজি ও জ্বালানি তেলের ব্যবসায় কমিশন বাণিজ্যের যেসব অভিযোগ উঠেছিল, সে বিষয়ে শুরুতেই অন্তর্বর্তী সরকারের জোরালো তদন্ত করার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু তা না করে তারা নীতিনির্ধারণে কাজ করছে, যা অন্তর্বর্তী সরকারের কাজ নয় বলে মনে করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু।
বণিক বার্তাকে ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, ‘আওয়ামী লীগের সময়ে জ্বালানি খাতে একটি বিশেষ সিন্ডিকেট ছিল। এ সিন্ডিকেট এখন বিদ্যুতের ওপর ভর করেছে। সরকার বিভিন্ন জায়গায় সংস্কারের কথা বলছে। বিভিন্ন জায়গায় সংস্কার করে সিন্ডিকেট নির্মূল করার কথা বলছে, কিন্তু বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত কেন সিন্ডিকেটমুক্ত হচ্ছে না এটা এখন বড় প্রশ্ন। এ সরকার এসে পলিসি ডিসিশন নিচ্ছে, এটা তো তাদের কাজ নয়।’
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জ্বালানি খাতে বড় ধরনের সংস্কারের যে প্রত্যাশা ছিল, অন্তর্বর্তী সরকার সেটি কতটা পূরণ করতে পেরেছে, তা এখন বড় প্রশ্ন। তবে একটা বিষয় পরিষ্কার: এ খাতের সমস্যা শুধু দখলদারত্ব বা নীতিনির্ধারণী কাঠামো নিয়ন্ত্রণ করে অর্থ আত্মসাৎ করে পালিয়ে যাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে উৎপাদন সক্ষমতা, বিদ্যুৎ সরবরাহের ধারাবাহিকতা এবং পুরো খাতের কাঠামোগত স্থিতিশীলতা। এগুলো এমন বিষয় নয়, যা কোনো সরকার এক বছরের মধ্যে পুরোপুরি বদলে ফেলতে পারবে বা হঠাৎ করে অন্য কারো হাতে তুলে দিয়ে সিন্ডিকেটমুক্ত করতে পারবে। প্রত্যাশা করা সহজ, কিন্তু বাস্তবে করা অত্যন্ত কঠিন। তবে উদ্বেগের জায়গা হলো এখনো জ্বালানি খাত জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর অবস্থায়ই রয়ে গেছে। সেখান থেকে ধীরে ধীরে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে যাওয়ার যে অঙ্গীকার বা সম্ভাবনা ছিল, সেই জায়গায় সরকার যথেষ্ট শক্তভাবে কিছু গড়ে তুলতে পারেনি।’
দেশের জ্বালানি খাত সংস্কার ও আমদানিতে সিন্ডিকেট বাণিজ্যের বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জ্বালানি খাতে যে সিন্ডিকেট ছিল তা সম্পূর্ণভাবে ভেঙে দেয়া হয়েছে। আগে ছয়-সাতটা সরবরাহকারী ছিল, এখন ২৫টি। হয়তো ব্যয় বেড়ে গেছে কিন্তু এলএনজি আমদানির পরিমাণও তো বেড়েছে।’
আওয়ামী লীগের আমলে নসরুল হামিদের আত্মীয়স্বজনের যে সিন্ডিকেট এলএনজি সরবরাহ করত, তাদের অনেকেই সরবরাহকারী হিসেবে কাজ পাচ্ছে—এমন অভিযোগের বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে উপদেষ্টা বলেন, ‘আমাদের কাছে তো কোনো কাগজ নেই। আর এগুলো নসরুল হামিদ সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি নয়, এগুলো সব আন্তর্জাতিক কোম্পানি। এগুলোর সঙ্গে নসরুল হামিদের সংশ্লিষ্টতা কী তা আমার জানা নেই।’